মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক একজন লতিফ ফরাজী

0
796

“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই,

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তাহার ক্ষয় নাই”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জ্বী আপনাকেই বলছি। দু’দিন আগে আপনি প্রশ্ন করেছিলেন “৩২ নম্বরে যখন বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে ছিলো তখন কোথায় ছিলো এতো নেতা”। এ প্রশ্নের উত্তরে থমকে যায় আপনার আশেপাশে থাকা চাটুকরের দল। নির্বাক হয়ে মুখ লুকায় পর্দার আড়ালে ।

কিন্তু বরগুনাবাসীর পক্ষ থেকে আজ এ প্রশ্নের
উত্তর দিতে চাই। গর্বের সাথে জানাতে চাই আমাদের উত্তরসূরীরা ছিলো সেদিনও রাজপথেই। তখন বরগুনা মহাকুমা থেকেই প্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ হয়েছিলো, “মুজিব হত্যার বিচার চাই” বলে হয়েছিলো মিছিল। আর সে মিছিলের অন্যতম সংগঠক ছিলেন একজন আব্দুল লতিফ ফরাজী। যার নেতৃত্বে সেদিন কেঁপেছিলো বরগুনা। মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা নেতাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন আমরা অকুতোভয়। সত্যের সাথে আপোষ করতে শিখিনি।

স্মৃতির ডাকঘরে আজ বলবো একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল লতিফ ফরাজীর কথা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রানিত একজন রাজনৈতিক সংগঠকের কথা। একজন বীর সেনানীর বিরত্ব গাঁথা।

কিছু কিছু মানুষের জীবনের অপর নাম হয়ে যায় রাজনীতি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ পথে হাঁটতে থাকেন বিরামহীন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি ও জনগণের অধিকার আদায়ের দাবীতে তারা নিরলস কাজ করে যান। এমনই একজন মানুষ আব্দুল লতিফ ফরাজী। ১৯৩৫ সালে বরগুনার সম্ভ্রান্ত মুসলিম ফরাজী পরিবারে জন্ম। বাবা আলহাজ্ব হোসেন উদ্দিন ফরাজী ও মা আয়াতুন বিবির অতি আদরের ও গর্বের সন্তান ছিলো লতিফ।

বরগুনাতেই শিক্ষা জীবন শুরু করে লতিফ ফরাজী। ছোটবেলা থেকেই দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি একটা অদম্য টান ছিলো তার। প্রায় ৭/৮ কিলোমিটার দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে ছুটে আসতেন দেশের খবর জানতে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের আমল। তাই মানুষে মানুষে বৈষম্য তাকে খুব ভাবাতো। ভাবলেন এ থেকে মুক্তি দরকার। আর রাজনীতিই হতে পারে বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলার সব থেকে বড় প্লাটফর্ম।

১৯৫৮-৬০ সন। শেখ মুজিবকে দেখে, তার কথা শুনে লতিফ ফরাজী ভেবে ফেলেন এমন একজন নেতাই তিনি খুঁজছেন। তিনিই খুলে দিতে পারেন বাঙালির মুক্তির দুয়ার। শুরু হলো তার রাজনৈতিক জীবন। শুরু হলো শেখ মুজিবকে অনুকরণও। তার মতো উল্টো করে চুলের আঁচর, তার হাঁটাচলা সবকিছুই যেনো তাকে অনুপ্রেরণা যোগাতো। আয়নার সামনে দাড়িয়ে খুঁজতেন চেহারার মিল। শেখ মুজিবের ভাষন শুনতে ঝুম বর্ষায় হাটু কাঁদা ভেঙ্গে ছুটে আসতেন শহরে। বজ্রকন্ঠের সেই ধ্বনি সারাদিন তার মধ্যে প্রতিধ্বনি হয়ে বাঁজতো।

১৯৬৮ – ১৯৭১ তার পরিচয় হলো আসমত আলী সিকদারের সাথে। আসমত আলী সিকদার তখন ফজলুল হক মনির সাথে ঢাকায় রাজনীতি করেন। লতিফ ফরাজী তার ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে উঠলেন। তারা যখন ঢাকা উত্তপ্ত করছেন লতিফ ফরাজী তখন নিজ জেলা সংগঠিত করতে ব্যস্ত। তিনি বুঝেছিলেন সব থেকে জরুরী নিজেদেরকে সংগঠিত করা। সকলকে বোঝানো আমরাও আলাদা দেশ পেতে পারি। আমাদেরও স্বাধীনতার অধিকার আছে। রাতের আঁধারে বাড়ী বাড়ী গিয়ে তিনি মুক্তিকামী মানুষদের সংগঠিত করতে থাকলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। লতিফ ফরাজী তখন একটি পরিচিত নাম হয়ে গিয়েছেন। বরগুনা ছাত্র সমাজের অহংকার ও বরগুনা আওয়ামীলীগের তখন অন্যতম সংগঠক তিনি৷ তার সাংগঠনিক কৃতিত্বে তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বরগুনা মহাকুমা মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ন আহ্বায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মুক্তিযুদ্ধে নেত্রীত্ব দেন। বরগুনাসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের দল গঠন, তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা ও সম্মুখ সমরে তার অবদান অনস্বীকার্য।

শেষ হলো যুদ্ধ। স্বাধীনতার মুক্ত বাতাসে এতোদিন দমবন্ধ করে রাখা মানুষগুলো বুক ভরে নিঃস্বাস নিলেন৷ স্বার্থক হলো একজন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা ৷ মুজিবের স্বপ্ন। সার্থক হলো লতিফ ফরাজীর
অনুসরণ ও অনুকরণ। বঙ্গবন্ধুর নেত্রীত্বে স্বাধীনতা আসবে এমন স্বপ্ন দেখেই যে তার বেড়ে ওঠা।

সন ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো।
এ খবর একজন লতিফ ফরাজীকে যেন নিঃস্ব করে দিলো। চোখের জলে ভাসলেন তিনি। ভাবলেন এ অন্যায় মেনে নেয়া মানে নিজের সত্ত্বাকে হত্যা করা। চোখের জল মুছলেন। শপথ নিলেন মৃত্যু হলেও তিনি এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন।

আজ যারা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসে শোক নামিয়ে আনেন। নাকি কান্নায় সুবিধা আদায় করে নেন, বঙ্গবন্ধুকে স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা কান খুলে শুনে রাখুন যখন আপনারা সেদিন ভয়ে মুখে কুলুপ এটে ছিলেন তখন বরগুনার মতো একটি অবহেলিত মহাকুমা থেকে প্রতিবাদ হয়েছিলো, হয়েছিলো মিছিল। আর সেই মিছিলের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন এই সংগঠক আব্দুল লতিফ ফরাজী।এস ডিও সিরাজ উদ্দিন, আসমত আলাী সিকদার, শাহাজাদা মালেক খান, নিজামুদ্দিন সহ আরো অনেককে সংগঠিত করে একজন লতিফ ফরাজী সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ মিছিলে সব থেকে বড় সংগঠকের ভুমিকা পালন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে মনোবল ভাঙলেও রাজনীতি ছাড়েননি লতিফ ফরাজী। তার আদর্শ বুকে নিয়ে নিষ্ঠার সাথে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কে সংগঠিত করে গেছেন। ১৯৮১ সনে ছিলেন বরগুনা জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি। ১৯৮২ সালে তৎকালীন অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা আর একজন বরগুনার গর্ব সিদ্দিক এম,পি মারা যাওয়ার পরে জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। নিজাম তালুকদার এম,পি হলে তিনি সভাপতি হন। তবে ১৯৮৮ সালে নিজাম উদ্দিন মারা যাওয়ার পরে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আবারও বরগুনা জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন লতিফ ফরাজী। যখনই আওয়ামীলীগের দুঃসময় ছিলো হাল
ধরেছেন শক্ত হাতে।

১৯৯৩ সালে কেন্দ্রিয় আওমীলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। কিছু কিছু মানুষের জীবনে নিজের জন্য পাওয়ার কিছু থাকেনা। এমপি, মন্ত্রী, ক্ষমতার লোভ লতিফ ফরাজীকে ছুঁতে পারেনি৷ তবে তিনি জীবনে মানুষের জন্য একটা জিনিস সরকারের কাছে চেয়েছেন। বরগুনা সদর থেকে চালিতাতলী, হেউলিবুনিয়া তার নিজ এলাকার সামনের পাকা সড়ক। যা শুধুই মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য চাওয়া ছিলো। যা আজ বরগুনার সাথে তালতলী, বগীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবেই পরিচিত। বাঁশবুনিয়া থেকে পরবর্তী সড়ক তার মৃত্যুর পর লতিফ ফরাজী সড়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

বরগুনা জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকাকালীন ২০০১ সালের ২১ শে জুন মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের এই মহান সংগঠক।
মৃত্যকালে তিনি ৬ ছেলে ও ৬ মেয়ে রেখে গেছেন। ছোট ছেলে রাসেল ফরাজী বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিকেই বেছে নিয়েছেন। বরগুনাতে তিনি এখন পরিচিত নাম। ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি৷ বর্তমানে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তার জন্য রইলো শুভ কামনা।

বেলাশেষে বলতে চাই, লতিফ ফরাজীরা মরে না। আমরা তাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলি। আসুন এই মহান বীরদের সম্মাণনা জানাই। ইতিহাস তুলে ধরি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। যে ইতিহাস আমাদের গর্বিত করেছে। যে ইতিহাস আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। পৃথিবীর মাণচিত্রে জায়গা করে দিয়েছে লাল সবুজের পতাকার।

স্যালুট হে বীর সেনানী ও সংগঠক একজন আব্দুল লতিফ ফরাজী। আমরা তোমাদের ভুলবো না।

আসাদ জামান
কবি ও কলামিস্ট।

(“স্মৃতির ডাকঘর” বরগুনার ইতিহাসের বীর, নেতৃত্ব প্রদানকারী ও গুণী ব্যক্তিদের জীবন ইতিহাস তুলে ধরতে চায়। তাই যে কোন তথ্য ও মতামত প্রাণের শহরের অথবা আসাদ জামানের ইনবক্সে দিলে বাধিত থাকিব।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here