একজন হুইলচেয়ারের নায়কের গল্প

0
541

১৯৮৭ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ মহসিন মাত্র আট মাস বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে দুই পায়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবুও ক্রিকেটই হয়ে ওঠে তার ধ্যানজ্ঞান। তবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে অনেক অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। সমবয়সীরা খেলতে নিতে অস্বীকৃতি জানাতো। যদিও এত কিছুর পরও ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাননি মহসিন।

২০১০ সালের কথা। কোনও কিছু না ভেবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন মোহাম্মদ মহসিন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা স্বত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছা-শক্তির বলেই যে ক্রিকেট খেলা যায়, ছবিতে এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। ওই ছবির কল্যাণেই পেয়ে যান তার মতো অদম্য কয়েকজন যোদ্ধাকে। ওখান থেকেই শুরু। ওই ছবি থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দেখে নতুন এক জানালা।

মাশরাফি বিন মুর্তজা-সাকিব আল হাসানদের মতো বাংলাদেশের পতাকা হাতে তারাও ঘুরে বেড়ান দেশ-বিদেশ।

কিন্তু বাংলাদেশ দলের তারকাদের মতো নন তারা। শারীরিকভাবে সাধারণ মানুষের মতো নন মহসিন ও তার দলের ক্রিকেটাররা। হুইল চেয়ারই এদের ভরসা। কিন্তু এসব কোনও কিছুই তাদের জন্য বাধা নয়। তারাও ব্যাট-বল হাতে মাঠ মাতিয়ে বেড়ান।

ফেসবুকের সেই ছবি দেখে ভারত থেকে হারুনুর রশিদ নামে এক ভদ্রলোক মহসিনের সাথে যোগাযোগ করেন। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ক্রিকেটে কাজ করার আগ্রহ দেখান তিনি। এর আগে নিজের জন্মস্থান গাজীপুরের টঙ্গীতেই ক্রিকেটটা চালালেও বড় পরিসরে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না মহসিনের। তাই নিজের গণ্ডির বাইরে কারও কাছ থেকে সহায়তার আশ্বাস পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে যান মহসিন।

২০১৩ ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখ রাতে হারুনুর রশিদ একজন সফরসঙ্গীসহ ঢাকায় আসেন। শুরু হয় মহসিনদের বড় পরিসরে যাত্রা। ২০১৪ সালের জুনে মহসিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল তাজমহল ট্রফি খেলতে ভারত সফরে যায়।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে ক্রিকেটের প্রতি মহসিনের ভালোবাসাটা বেড়ে যায়। জীবন চালানোর প্রয়োজনে একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটে সময় দিতে গিয়ে সেটাও বিক্রি করে দেন। ক্রিকেট ছাড়া আর কিছু করার কথাও চিন্তাও করেননি। ক্রিকেট নিয়েই আছেন৷ এটা নিয়েই থাকার ইচ্ছা।

ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে অনেকদিক থেকেই বাধা এসেছে। তবুও এগিয়ে যাচ্ছেন। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির আশ্বাস পেয়েছেন। এছাড়া বিসিবি পরিচালক নাইমুর রহমান দুর্জয় বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের তত্বাবধানের দায়িত্ব নিয়েছেন।

এক ভাই ও এক বোনের পরিবারের বড় ছেলে মহসিন বর্তমানে দুই কন্যা সন্তানের বাবা। লিজা আক্তার ও মহসিনের দুই কন্যা ইয়াসা মারদিনা সাফা ও রাইসা সাবা। বাবা মোহাম্মদ আব্দুল সাত্তার পেশায় কৃষক এবং মা মরিয়ম বেগম গৃহীনি। এমন অবস্থা থেকেও শারীরিক অক্ষমতা কাটিয়ে একের পর এক বিজয় নিশান উড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার পরিচয় কেবল ক্রিকেটার হিসেবে নয়, তিনি একজন সফল সংগঠকও। তরুণদের নিয়ে কাজ করার পুরস্কার হিসেবে ২০১৭ সালে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন মহসিন।

ইচ্ছা আছে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার। সে লক্ষ্যেই কমিশনার পদে নির্বাচন করারও ইচ্ছা আছে।

মেহেরিনা কামাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here